Wednesday, August 7, 2019

আজ ২২শে শ্রাবণ-বিশ্বকবিকে বনেদীয়ানা'র প্রণাম


আজ ২২শে শ্রাবণ, ১৪২৬ ১৯৪১ সালের ২২শে শ্রাবণ বিশ্বকবির জীবনাবসান হয়, কিন্তু তাঁর রচিত সংগীত, রচিত কবিতা, গল্প, নাটক, উপন্যাসে তিনি আজও জীবিত "মৃত্যুঞ্জয়ী" আজও আমরা তাঁর রচিত অমূল্য সম্পদ নিয়ে বেঁচে আছি তাই আজ এই দিনটিকে অন্যভাবে স্মরণ করলাম আমরা "বনেদীয়ানা"পরিবার বনেদীয়ানা পরিবারের পক্ষথেকে তাঁর শ্রীচরণে প্রণাম রইল, রইল শ্রদ্ধা আজ প্রকাশিত হল বনেদীয়ানা পরিবারের সদস্য শ্রীমান্ অমিত দে' সংগ্রহের সেই তথ্য যা আজ দিনটিকে খুবই প্রাসঙ্গিক করে তুলবে বলে আমাদের বিশ্বাস
" আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধুলার তলে সকল অহঙ্কার হে তোমার ডুবাও চোখের জলে।।"

রবীন্দ্রানাথ ঠাকুর :- (২৫-শে বৈশাখ,১২৬৮২২-শে  শ্রাবণ,১৩৪৮ বাঙ্গাব্দ)
তিনি ছিলেন একদিকে যেমন :- অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী দার্শনিক তাঁকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মনে করা হয় রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব, কবিগুরু বিশ্বকবি অভিধায় ভূষিত করা হয় রবীন্দ্রনাথের ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস ৩৬টি প্রবন্ধ অন্যান্য গদ্যসংকলন, তাঁর জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত হয় তাঁর সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প ১৯১৫টি গান[ যথাক্রমে গল্পগুচ্ছ গীতবিতান সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা খণ্ডে রবীন্দ্র রচনাবলী নামে প্রকাশিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় পত্রসাহিত্য উনিশ খণ্ডে চিঠিপত্র চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত এছাড়া তিনি প্রায় দুই হাজার ছবি এঁকেছিলেন রবীন্দ্রনাথের রচনা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন


শৈশব কৈশোর (১৮৬১ - ১৮৭৮) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতার জোড়াসাঁকো, ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন১৯০১

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তাঁর পিতা ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মগুরু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭১৯০৫) এবং মাতা ছিলেন সারদাসুন্দরী দেবী (১৮২৬১৮৭৫) রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পিতামাতার চতুর্দশ সন্তান জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার ছিল ব্রাহ্ম আদিধর্ম মতবাদের প্রবক্তা
১৮৭৫ সালে মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের মাতৃবিয়োগ ঘটে পিতা দেবেন্দ্রনাথ দেশভ্রমণের নেশায় বছরের অধিকাংশ সময় কলকাতার বাইরে


অতিবাহিত করতেন তাই ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান হয়েও রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা কেটেছিল ভৃত্যদের অনুশাসনে
ছাত্র জীবন :- শৈশবে রবীন্দ্রনাথ কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, নর্ম্যাল স্কুল, বেঙ্গল অ্যাকাডেমি এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলে কিছুদিন করে পড়াশোনা করেছিলেন কিন্তু বিদ্যালয়-শিক্ষায় অনাগ্রহী হওয়ায় বাড়িতেই গৃহশিক্ষক রেখে তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ পিতার কাছ থেকে সংস্কৃত ব্যাকরণ, ইংরেজি, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সাধারণ বিজ্ঞান ইতিহাসের নিয়মিত পাঠ নিতেন

যৌবন (১৮৭৮-১৯০১)
১৮৭৮ সালে ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ডে যান রবীন্দ্রনাথ প্রথমে তিনি ব্রাইটনের একটি পাবলিক স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন ১৮৭৯ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে আইনবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন কিন্তু সাহিত্যচর্চার আকর্ষণে সেই পড়াশোনা তিনি সমাপ্ত করতে পারেননি অবশেষে ১৮৮০ সালে প্রায় দেড় বছর ইংল্যান্ডে কাটিয়ে কোনো ডিগ্রি না নিয়ে এবং ব্যারিস্টারি পড়া শুরু না করেই তিনি দেশে ফিরে আসেন

দাম্পত্য জীবন :- ১৮৮৩ সালের ডিসেম্বর (২৪ অগ্রহায়ণ, ১২৯০ বঙ্গাব্দ) ঠাকুরবাড়ির অধস্তন কর্মচারী বেণীমাধব রায়চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিবাহ সম্পন্ন হয় বিবাহিত জীবনে ভবতারিণীর নামকরণ হয়েছিল মৃণালিনী দেবী (১৮৭৩১৯০২ ) রবীন্দ্রনাথ মৃণালিনীর সন্তান ছিলেন পাঁচ জন: মাধুরীলতা (১৮৮৬১৯১৮), রথীন্দ্রনাথ (১৮৮৮১৯৬১), রেণুকা (১৮৯১১৯০৩), মীরা (১৮৯৪১৯৬৯) এবং শমীন্দ্রনাথ (১৮৯৬১৯০৭) এঁদের মধ্যে অতি অল্প বয়সেই রেণুকা শমীন্দ্রনাথের মৃত্যু ঘটে


মধ্য জীবন (১৯০১১৯৩২) ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ সপরিবারে কলকাতা ছেড়ে চলে আসেন বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের উপকণ্ঠে শান্তিনিকেতনে এখানে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৮ সালে একটি আশ্রম ১৮৯১ সালে একটি ব্রহ্মমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আশ্রমের আম্রকুঞ্জ উদ্যানে একটি গ্রন্থাগার নিয়ে রবীন্দ্রনাথ চালু করলেন "ব্রহ্মবিদ্যালয়" বা "ব্রহ্মচর্যাশ্র" নামে একটি
পরীক্ষামূলক স্কুল ১৯০২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে কবিপত্নী






মৃণালিনী দেবী মারা যান এরপর ১৯০৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর কন্যা রেণুকা, ১৯০৫ সালের ১৯ জানুয়ারি পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৭ সালের ২৩ নভেম্বর কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়

এসবের মধ্যেই ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন ১৯০৬ সালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠান আধুনিক কৃষি গোপালন বিদ্যা শেখার জন্য ১৯০৭ সালে কনিষ্ঠা জামাতা নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কেও কৃষিবিজ্ঞান শেখার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ

এই সময় শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মবিদ্যালয়ে অর্থসংকট তীব্র হয়ে ওঠে পাশাপাশি পুত্র জামাতার বিদেশে পড়াশোনার ব্যয়ভারও রবীন্দ্রনাথকে বহন করতে হয় এমতাবস্থায় রবীন্দ্রনাথ স্ত্রীর গয়না পুরীর বসতবাড়িটি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন

ইতোমধ্যেই অবশ্য বাংলা বহির্বঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কবিখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল ১৯০১ সালে নৈবেদ্য ১৯০৬ সালে খেয়া কাব্যগ্রন্থের পর ১৯১০ সালে তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি প্রকাশিত হয় ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি (ইংরেজি অনুবাদ, ১৯১২) কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য সুইডিশ অ্যাকাডেমি রবীন্দ্রনাথকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করে ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে 'স্যার' উপাধি (নাইটহুড) দেয়

১৯২১ সালে শান্তিনিকেতনের অদূরে সুরুল গ্রামে মার্কিন কৃষি-অর্থনীতিবিদ লেনার্ড নাইট এলমহার্স্ট, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শান্তিনিকেতনের আরও কয়েকজন শিক্ষক ছাত্রের সহায়তায় রবীন্দ্রনাথ "পল্লীসংগঠন কেন্দ্র" নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন এই সংস্থার উদ্দেশ্য ছিল কৃষির উন্নতিসাধন, ম্যালেরিয়া ইত্যাদি রোগ নিবারণ, সমবায় প্রথায় ধর্মগোলা স্থাপন, চিকিৎসার সুব্যবস্থা এবং সাধারণ গ্রামবাসীদের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি করা১৯২৩ সালে রবীন্দ্রনাথ এই সংস্থার নাম পরিবর্তন করে রাখেন "শ্রীনিকেতন" শ্রীনিকেতন ছিল মহাত্মা গান্ধীর প্রতীক প্রতিবাদসর্বস্ব স্বরাজ আন্দোলনের একটি বিকল্প ব্যবস্থা উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীর আন্দোলনের পন্থা-বিরোধী ছিলেন পরবর্তীকালে দেশ বিদেশের একাধিক বিশেষজ্ঞ, দাতা অন্যান্য





পদাধিকারীরা শ্রীনিকেতনের জন্য আর্থিক অন্যান্য সাহায্য পাঠিয়েছিলেন
১৯৩০-এর দশকের প্রথম ভাগে একাধিক বক্তৃতা, গান কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় সমাজের বর্ণাশ্রম প্রথা অস্পৃশ্যতার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন


শেষ জীবন (১৯৩২-১৯৪১) ১৯৩০ সালে বার্লিনে রবীন্দ্রনাথ জীবনের  শেষ দশকে (১৯৩২-১৯৪১) রবীন্দ্রনাথের মোট পঞ্চাশটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয় তাঁর এই সময়কার কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য পুনশ্চ (১৯৩২), শেষ সপ্তক (১৯৩৫), শ্যামলী পত্রপুট (১৯৩৬) – এই গদ্যকবিতা সংকলন তিনটি জীবনের এই পর্বে সাহিত্যের নানা শাখায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল হলো তাঁর একাধিক গদ্যগীতিকা নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা (১৯৩৬; চিত্রাঙ্গদা (১৮৯২) কাব্যনাট্যের নৃত্যাভিনয়-উপযোগী রূপ শ্যামা (১৯৩৯) চণ্ডালিকা (১৯৩৯) নৃত্যনাট্যত্রয়ী এছাড়া রবীন্দ্রনাথ তাঁর শেষ তিনটি উপন্যাসও দুই বোন (১৯৩৩), মালঞ্চ (১৯৩৪) চার অধ্যায় (১৯৩৪)) এই পর্বে রচনা করেছিলেন তাঁর অধিকাংশ ছবি জীবনের এই পর্বেই আঁকা এর সঙ্গে সঙ্গে জীবনের শেষ বছরগুলিতে বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধ সংকলন বিশ্বপরিচয় এই গ্রন্থে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানের আধুনিকতম সিদ্ধান্তগুলি সরল বাংলা গদ্যে লিপিবদ্ধ করেছিলেন পদার্থবিদ্যা জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁর অর্জিত জ্ঞানের প্রভাব পরিলক্ষিত হয় তাঁর কাব্যেও সে (১৯৩৭), তিন সঙ্গী (১৯৪০) গল্পসল্প (১৯৪১) গল্পসংকলন তিনটিতে তাঁর বিজ্ঞানী চরিত্র-কেন্দ্রিক একাধিক গল্প সংকলিত হয়েছে

জীবনের এই পর্বে ধর্মীয় গোঁড়ামি কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্রতম প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৪ সালে ব্রিটিশ বিহার প্রদেশে ভূমিকম্পে শতাধিক মানুষের মৃত্যুকে গান্ধীজি "ঈশ্বরের রোষ" বলে অভিহিত করলে, রবীন্দ্রনাথ গান্ধীজির এহেন বক্তব্যকে অবৈজ্ঞানিক বলে চিহ্নিত করেন এবং প্রকাশ্যে তাঁর সমালোচনা করেন কলকাতার সাধারণ মানুষের আর্থিক দুরবস্থা ব্রিটিশ বাংলা প্রদেশের দ্রুত আর্থসামাজিক অবক্ষয় তাঁকে বিশেষভাবে বিচলিত করে তুলেছিল গদ্যছন্দে রচিত একটি শত-পংক্তির কবিতায় তিনি এই ঘটনা চিত্রায়িতও করেছিলেন





জীবনের শেষ চার বছর ছিল তাঁর ধারাবাহিক শারীরিক অসুস্থতার সময় এই সময়ের মধ্যে দুইবার অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী থাকতে হয়েছিল তাঁকে ১৯৩৭ সালে একবার অচৈতন্য হয়ে গিয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থা হয়েছিল কবির সেবার সেরে উঠলেও ১৯৪০ সালে অসুস্থ হওয়ার পর আর তিনি সেরে উঠতে পারেননি এই সময়পর্বে রচিত রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুলি ছিল মৃত্যুচেতনাকে কেন্দ্র করে সৃজিত কিছু অবিস্মরণীয় পংক্তিমালা মৃত্যুর সাত দিন আগে পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টিশীল ছিলেন দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৯৪১ সালে ২২-শে শ্রাবণ জোড়াসাঁকোর বাসভবনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

[ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আন্মজীবনী উপলক্ষে উপরিউক্ত সম্পূর্ণ তথ্যাবলী অন্যান্য পূস্তক সমূহ ইন্টারনেট পরিষেবা মাধ্যম দ্বারা সংগৃহীত করা হয়েছে ]
তথ্যসূত্র সংগ্রহেঃ শ্রীমান্ অমিত দে



Tuesday, August 6, 2019

দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর দে পরিবার

ঐতিহ্যের ইতিহাসপর্বঃ

আজ প্রকাশিত হল দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর দে পরিবারের দেবীপূজার ইতিহাস ইতিহাস সংগ্রহ করলেন পরিবারের সদস্য শ্রীমান্ শুভদীপ রায় চৌধুরী দে পরিবারের সদস্য শ্রী দেবরাজ দে মহাশয়কে অনেক অভিনন্দন শারদ শুভেচ্ছা জানাই

১৫০ বছরের ইতিহাস সম্বলিত ভবানীপুর দে বাড়িতে ইংরেজ-অসুর দমনকারীনি দেবী দুর্গার আরাধনা :-

ভবানীপুর দে বাড়ির দুর্গা পুজোর ইতিহাস জানতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে ১৫০ বছর আগে, অষ্টাদশ শতকে
ইতিহাস বই এর পাতা থেকে ব্রিটিশ শাসন সম্পর্কে কম বেশি সবাই পড়েছি আজ আপনারা জানবেন সেই সময়ে শুরু হওয়া ঐতিহ্যবাহী একটি বনেদি পরিবারের দুর্গা পুজোর কথা যা গোরা সাহেব বিরোধী কার্যকলাপের ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে আজও বিরাজমান


ভবানীপুর দে পরিবারের পুজোর সূচনা করেছিলেন শ্রী রামলাল দে মহাশয় তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে, গোবরডাঙ্গায় পরবর্তী কালে ব্যবসায়িক সূত্রে তিনি দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরে আসেন এবং স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন ঈশ্বরের কৃপায় তাহার তুলো সয্যা দ্রব্যের ব্যবসা ধীরে ধীরে সমৃদ্ধি লাভ করতে থাকে সেই সয্যা দ্রব্যের ব্যবসা বংশ পরম্পরায় আজও বর্তমান

এবার আসা যাক পুজোর কথায়...
গুরুজনদের থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শুনে আসা কথা অনুযায়ী - পুজোর শুরু হয়েছিল দেবীর মাতৃরুপী আগমনের মাধ্যমে একদিন সন্ধ্যায় এক লাল পাড় সাদা শাড়ি পরিহিত মহিলা তাহার দুই পুত্র দুই কন্যা সন্তানকে নিয়ে প্রবেশ করেন এই ২৬ নং চন্দ্রনাথ স্ট্রিট-এর বাড়িতে তিনি তার সন্তানদের নিয়ে কাউকে কিছু না বলেই গৃহের দালান হতে ভিতর মহলের উদ্দেশ্যে রওনা হন বাড়ির এক সদস্যা তৎক্ষণাৎ তাহার পিছু নেওয়া সত্ত্বেও পরবর্তী মুহূর্তে তাহাদের বাড়ির কোথাও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি বেশ কিছু দিন পরে সেই একই বেশে সেই মহিলাকে আবারও দেখা যায় বাড়ির ছাদের কারনিশে বসে পা দোলাতে ইতিমধ্যে শ্রী রামলাল দে- সেই একই বেশ ধারনকারী মহিলার স্বপ্নাদেশ পান দেবী দুর্গার পূজা করার জন্য সেই বছর অর্থাৎ ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ থেকে দেবী দুর্গাকে মাতৃ রূপে পুজো শুরু করেছিলেন রামলাল দে


পরবর্তী সময়ে এই বাড়ির পুজোর সাথে জড়িয়ে পড়েছিলো স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছিলো ইংরেজদের তুমুল অত্যাচার অপসাসন ক্রমশ মাথাচারা দিচ্ছিলো স্বদেশীদের স্বাধীনতা সংগ্রাম বংশ পরম্পরায় আমরা শুনে আসছি ব্রিটিশ সরকারের অরাজকতা ভারতীয়দের উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই বিগত অষ্টাদশ শতক থেকে মহিষাসুরকে ব্রিটিশ সাহেবের রূপ দান করা হয় কালো কোট বুট পরিহিত গোরা সাহেব বিরাজমান থাকেন মা দুর্গার পায়ের তলায় দেবী দুর্গা ত্রিশূল দিয়ে সাহেব রুপী অশুভ শক্তির বিনাশ করেন সেই রূপ আজও অপরিবর্তিত

বর্তমানে দেবীর পূজা করে আসছেন শ্রী রামলাল দে' তিন পুত্রের মধ্যে দুই পুত্র শ্রী অতুল কৃষ্ণ দে শ্রী অনুকূল কৃষ্ণ দে' বংশধরেরা
বংশ পরম্পরায় প্রতি বছর রথ-যাত্রার দিন কাঠামো পুজোর মাধ্যমে দেবী দুর্গার আরাধনার সূচনা করা হয়
এক-চালার সাবেকি প্রতিমা পূজিত হন একই কাঠামোতেই অর্থাৎ দেবীর বিসর্জনের পর কাঠামো ফিরিয়ে আনা হয় পরের বছর সেই ১৫০ বছরের পুরোনো কাঠামোতেই পূজিত হন দেবী দুর্গা


প্রতি বছর জন্মাষ্টমীর পর থেকে প্রতিমার নির্মাণকার্য শুরু হয় বাড়ির ঠাকুর দালানেই ইংরেজ-অসুর নিধন ছাড়াও মূর্তির বিশেষত্ত্ব হল দেবীর বাহন রূপে থাকা সিংহের গায়ের রঙ হল সাদা
কুমোরের মূর্তি নির্মাণের পর, পরিবারের সদস্যরা নিজে হাতেই দেবীকে সাজিয়ে তোলেন চতুর্থীর দিন পরিবারের মহিলারা দেবীর জন্য নারকেল নাড়ু প্রস্তুত করেন সিঁদুর দিয়ে রাঙানো দেবীর অস্ত্র দান করা হয় বোধনের প্রাক্কালে নিত্য ভোগ রূপে ১৩ টি লুচি ১৩ রকমের মিষ্টি দেবীকে অর্পণ করা হয়


অষ্টমী তিথিতে কুমারী সদবা পুজোর সাথে সাথে এই বাড়ির মহিলা সদস্যাদের মাথায় দুই হাতে সরা নিয়ে ধুনো পোড়ানোর রীতি আজও প্রচলিত
অষ্টমী নবমী তিথির সন্ধিক্ষনে ৪৮ মিনিটের সন্ধি পুজোতে ফল ২১ কিলো চাল দিয়ে নির্মিত নৈবিদ্য দেবী কে উৎসর্গ করা হয় তার সাথে ১০৮ প্রদীপ ১০৮ পদ্মের মালার নিবেদন আবশ্যিক

পুজোর প্রাক্কালে পরিবারের সকল সদস্য একত্রিত হয় এবং সম্মিলিত ভাবে নৃত্য, সঙ্গীত, আবৃত্তি, নাটক প্রভৃতি শিল্পকলা পরিবেশনের মাধ্যমে আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে


বিজয়া দশমীর দিন জল-আয়নায় দেবীর চরণ দর্শন, দেবীকে বরণ সিঁদুর খেলার মাধ্যমে দেবীকে বিদায় জানানো হয়
অতীতের ন্যায় বর্তমানেও এক-চালার প্রতিমা বাঁশে বেঁধে, কাঁধে করেই হেঁটে গঙ্গায় গিয়ে প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয় এবং কাঠামো ফিরিয়ে আনা হয়
কৃতজ্ঞতাস্বীকারঃ- শ্রী দেবরাজ দে
সংগ্রহেঃ- শ্রীমান্ শুভদীপ রায় চৌধুরী