দীপান্বিতাপর্বঃ-২
আজ
দ্বিতীয়পর্ব প্রকাশিত হল। সামনেই কালীপুজো, আলোর উৎসব। সকলকে আগাম শুভেচ্ছা জানাই বনেদীর-বনেদীয়ানা পরিবারের পক্ষথেকে। আজ প্রকাশিত হল দক্ষিণ কলকাতার বহড়ু অঞ্চলে ময়দা কালীবাড়ির ইতিহাস। লিপিবদ্ধ করলেন বনেদীয়ানা পরিবারের সদস্য শ্রীমান শুভদীপ রায় চৌধুরী। চলুন দেখা যাক সেই কালীমন্দিরের ইতিহাস।
দীপান্বিতায় ময়দা কালীবাড়িঃ- দক্ষিণ কলকাতা
কলকাতার কালীমন্দিরের মধ্যে অন্যতম কালীমন্দির এই ময়দা কালীবাড়ি। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে লক্ষ্মীকান্তপুর লোকালে করে বহড়ু স্টেশন। সেখানে নামলেই যাওয়া যায় ময়দা গ্রাম। এই 'ময়দা' নামের উৎপত্তি নিয়ে দুইটি কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। একটি হল পর্তুগিজদের নিয়ে। বহড়ুর এই অঞ্চল আদিগঙ্গার প্রবাহপথের ওপর অবস্থিত। বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করার রাস্তা হিসাবে এই জলপথটি পর্তুগিজ জলদস্যু ও ব্যবসায়ীদের খুবই পছন্দ ছিল। তারা এই অঞ্চলটিকে বলত- 'মদিয়া', সেখান থেকেই এসেছে ময়দা গ্রাম। আর একটি হল রাবণরাজার শ্বশুরমশাই তথা ব্রহ্মার বরপ্রাপ্ত স্থপতি ময়দানবের বাস ছিল এখানেই। তাঁর নামেই এই অঞ্চলটির নাম ময়দা। ময়দা গ্রামের পূর্বদিকে উত্তর থেকে দক্ষিণ বরাবর একটি রাস্তা প্রসারিত ছিল, বর্তমানে সেটি লুপ্ত। সেই রাস্তাটি ছিল তীর্থপথ। হরিদ্বার থেকে সাগর পর্যন্ত প্রসারিত এই পথ ব্যবহার করতেন তীর্থযাত্রীরা। কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর চৈতন্যচরিতামৃত ও বৃন্দাবনদাসের চৈতন্যভাগবত থেকে জানা যায়, শ্রীচৈতন্যদেবের সপার্ষদ নীলাচলযাত্রার পথও ছিল এটি। আদিগঙ্গার প্রবাহপথ ধরে শ্রীচৈতন্য ময়দা গ্রামের উত্তরে বারুইপুরের কাছে আটিসারা গ্রামে আসেন। সেখানে তিনি এক পণ্ডিতের বাড়িতে আশ্রয় নেন। তারপর তিনি সেই আদিগঙ্গার পূর্ব তীরস্থ দ্বারির জাঙ্গাল দিয়ে গিয়ে সেখান থেকে নৌকাযোগে জগন্নাথধাম যান। সেই ময়দা গ্রামেই ময়দা কালীবাড়ি।
মন্দিরের ফটকের মাথায় লেখা 'ময়দানবের পরমারাধ্যা দেবী পাতালভেদী দক্ষিণাকালী ময়দানবেশ্বরী'। সামনেই নাটমন্দির, তার পিছনেই মায়ের মন্দির। ৭৩শতক জায়গা জুড়ে এই মন্দির চত্বর। পশ্চিমে মায়ের পুকুর ১বিঘা জমি নিয়ে। মায়ের মন্দিরের পূর্ব-দক্ষিণে শিবমন্দির। পেছনে পশ্চিমে সাধক ভবানী পাঠকের পঞ্চমূণ্ডির আসন। ময়দার পাতালভেদী কালীমন্দির বড়িশার সাবর্ণ রায় চৌধুরীরা নির্মাণ করেন ১১৭৬ বঙ্গাব্দে এবং রাঢ়ীয় বন্দ্যোপাধ্যায়দের মন্দিরের পুরোহিত ও সেবায়েত হিসাবে নিযুক্ত করেন। হঠাৎ এখানেই কেন মন্দির প্রতিষ্ঠিত হল এই নিয়ে একটি কাহিনী আছে।ময়দা গ্রামে এহেন কালীমাতার মন্দিরের ব্যাপারে সাবর্ণ চৌধুরীদের অবদান আছে। এই পরিবারের জমিদার গঙ্গাপথে বজরায় চড়ে বেরিয়ে ওই বকুল গাছের ডালে এক বালিকাকে হাসতে খেলতে দেখেছিলেন। তিনি বজরা থামিয়ে বালিকাকে ধরতে গেলে মঝিমল্লারগণ বলেন-” ও ডাইনি বাবু। বালিকা নয়।” সেই দিন রাত্রে জমিদার স্বপ্নে দেখলেন- “আমাকে ধরার চেষ্টা করিস না। আমি ত্রেতাযুগের রামায়ণে বর্ণিত রাবণের শ্বশুর ময়দানবের আরাধ্যা দক্ষিণাকালী।” পরদিন সাবর্ণ বংশের জমিদার লোক লাগিয়ে মাটি খুঁরে এক শিলা দেখতে পান তবে কোন মূর্তি পাননি। তখন তাকে নির্দেশ দেন- “ওই শিলার মধ্যেই আমি বিরাজ করছি, আমাকে তুলতে পারবি না। ওই খানেই আমার মন্দির তৈরী করে দে। সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারের জমিদার ওই স্থানেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পাতালভেদী শিলাকেই দক্ষিণাকালীর ধ্যানে পূজা করা হয়। এই দক্ষিণাকালীর জন্য শুধু ময়দা গ্রামেই নয় পাশ্ববর্তী গ্রামসমূহেও কোণ বাড়িতে কালীপুজো হয় না। তবে কালীপুজো সময় সাবর্ণ রায় চৌধুরীদের নামে সংকল্প করে আজও জোড়া পাঁঠাবলি দেওয়া হয়।
কালীপুজো উপলক্ষে মন্দিরে সাজো সাজো রব ওঠে। শুধুমাত্র কালীপুজোতেই নয়, বিশেষ বিশেষ তিথিতে মন্দিরে মাকে পুজো দেওয়ার জন্য ভক্তদের লাইন পড়ে। মায়ের পুকুরে স্নান করে পুণ্যার্থীরা ময়দানবের পরমারাধ্যা দেবী পাতালভেদী ময়দানবেশ্বরী দক্ষিণাকালীর পুজো দেন। ময়দা কালীবাড়ির উন্নয়ন সমিতি কর্তৃক নাটমন্দির নির্মিত হয়। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অন্যতম নিদর্শন এই কালীবাড়ি। কালীপুজোর দিন ভক্তদের লাইন, তা দেখবার মতন। সবাই দূরদূরান্ত থেকে আসেন মাকে পুজো দেওয়ার জন্য। আজও এই কালীবাড়িতে এলে ইতিহাস যেন কথা বলে-এমনই অনুভূতি হয়।
তথ্যসূত্র লিপিবদ্ধেঃ- শ্রীমান শুভদীপ রায় চৌধুরী



No comments:
Post a Comment