ঐতিহ্যের
ইতিহাসপর্বঃ
ইতিহাসবিস্মৃত
করন্দা। পূর্ব
বর্ধমান।
বনেদীর
বনেদীয়ানা'র একজন সদস্য
হিসেবে মাঝেমধ্যেই সময়-সুযোগ করে
এদিকওদিক বেড়িয়ে পড়ি।
কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যস্থির করে নয়, এমনিই
যেদিকে ইচ্ছে হয় সেদিকেই;
নতুন কিছু পাওয়ার আশায়। আর
যখন পাওয়ার বিষয়টা ইতিহাস-ভিত্তিক তখন কোথায় কী
পাওয়া যায়, সেটাতো আগে
থেকে জানাও যায়না।
মনিষীরা বলে গেছেন, "যেখানে
দেখিবে ছাই... উড়াইয়া দ্যাখো
তাই... পাইলেও পাইতে পারো
অমূল্যরতণ"।
না, ছাই উড়িয়ে দেখতে
যাইনি। গেছিলাম
ঠাকুরমা'র মুখে ছোটোবেলায়
শোনা কিছু খাপছাড়া ইতিহাস,
ছেলেভোলানো গল্পের সুলুকসন্ধানে।
চর্মচক্ষুতে সেসব প্রত্যক্ষ করতে। আর
গিয়ে যা পেলাম, "..... জন্মজন্মান্তরেও
ভুলিবো না!"
আজকের
একবিংশ শতকের ছোঁয়ায় আমাদের
পল্লীবাঙলার যে গ্রামগুলি আস্তে
আস্তে শহুরে জীবনযাত্রার অনুকরণে
ব্যস্ত, সেরকমই এক গ্রামে
গেছিলাম সেদিন। আমার
স্বর্গীয়া ঠাকুরমা'র পিত্রালয়, করন্দা।
পালসিট
রেলস্টেশন থেকে টোটো ধরে
যাচ্ছিলাম। পাকারাস্তা
এঁকেবেঁকে এ-পুকুর, ও-পুকুরের পাশ কাটিয়ে 'ছায়াসুনিবিড়'
ছোটোবড় জনপদ পেড়িয়ে ব্যাটারিচালিত
যান'টি এগোচ্ছে! যাঁরা
গ্রামে থাকেন বা কখনও
গেছেন তাঁরা আশাকরি বুঝবেন
যে, ঐ গেঁয়ো ভাঙাচোরা
পিচরাস্তায় হেলেদুলে, ঝাঁকুনি খেয়ে যাবার একটা
আলাদা মজা আছে৷ সেইভাবেই
পল্লীজননীর অফুরন্ত ভাণ্ডারের শোভা লক্ষ্য করে
এগিয়ে চলেছি। গাড়ীর
গতি আর রাস্তার অহেতুক
মনোমালিন্যে মাঝেমধ্যেই নেশা চটকে যাচ্ছে। তাও
দেখে চলেছি.... কৃষ্ণচূড়া, কদম, সোনাঝুড়ি গাছের
আড়াল থেকে ধানের ক্ষেতে
হাওয়ার জোয়ার! নিজের অজান্তেই
মনে মনে আওড়ে যাচ্ছিলাম,
"নমো নমো নমো, সুন্দরী
মম..."
প্রকৃতির
কোলে স্বচ্ছন্দ বিচরণ করতে করতেই
কখন যে গন্তব্যে এসে
পৌঁছেছি, খেয়ালই করিনি।
টোটোওয়ালার ডাকে ঘোর কাটলো। "দাদা, করন্দা
বারোয়ারী তলা এসে গেছি"। ভাড়া
মিটিয়ে সবে নামতে যাবো;
সামনের দিকে চোখ পড়তেই
সজোরে এক ধাক্কা... কোথায়
এলাম! একি সত্যি সত্যিই
যেখানে আসার জন্য বেড়িয়েছি,
সেই জায়গা! যা দেখছি,
ঠিক দেখছি তো!...... সামনেই
এক মাঝারি মাপের পোড়োমন্দির,
চূড়া ফাটিয়ে অশ্বত্থের অবাঞ্ছিত
ও ইতস্ততবিক্ষিপ্ত বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। এসব
তো কতই দেখেছি।
তবে! চোখ আটকে আছে
মন্দিরের ভাঙা দরজার জায়গাটাতে।
এককালে
হয়তো ঐ জায়গাটায় বড়সড়
চৌকাঠ ছিলো, এখন ভেঙে
পড়া মন্দিরের চুনসুরকিতে ঢিবি হয়ে রয়েছে...
আর তারউপরে পড়ে আছে এক
মস্ত শিবলিঙ্গের ভাঙা গৌরীপট্ট... সেটিও
আস্ত নেই গোটা আটদশেক
টুকরোতে ভেঙে পড়ে আছে। দু'পা এগিয়ে মন্দিরের
কাছে গিয়ে দেখি কি,
গর্ভগৃহের ভিতরে একটি নয়
প্রায় তিন/চারটি ভাঙা
শিবলিঙ্গ এদিকওদিক বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে! ভাঙা
অংশগুলো দেখে সহজেই অনুমান
করা যায়, এক-একটি
প্রায় দেড়হাতের কাছাকাছি উচ্চতার কোষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ ছিলো এককালে! প্রথম
ধাক্কা এভাবেই পেলাম...... বেশ
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে, এদিকওদিক ঘুরে পুরো মন্দিরটা
দেখলাম। করন্দা
যে তার প্রথম দর্শনেই
এতটা হতাশ করে দেবে,
নাহ্! সত্যিই ভাবিনি।
যাইহোক, উঠলাম "মামাদাদু"-র বাড়ীতে।
পরের ঘটনা গুলো বাদ
দিলাম, সেটা গ্রুপে আলোচনার
পরিপন্থী নয়।
দুপুরে
খাওয়ার সময়ে কথায় কথায়
গ্রামের ইতিহাস জিজ্ঞেস করাতে
মামাদাদু বলেছিলেন, "একসময়ে ১০৮টা শিবমন্দির
ছিলো। গুড়াপ
থেকে শুরু করে শক্তিগড়
অব্দি।"......... শুনেই চমকে উঠি!
পাঠকগণ যদি আমার পূর্ববর্তী
পোস্টটি(শ্রী শ্রী নন্দদুলাল,
গুড়াপ) পড়ে থাকেন, তাহলে
আশা করি আমার চমকানোর
কারণটা কিছুটা হলেও আভাস
পাবেন। তাহলে,
বর্ধমান মহারাজের প্রতিরক্ষা বিভাগীয় কর্মচারী সেই রামদেব নাগের
যে অতুলনীয় কীর্তি তারই ধারা
সূদুর গুড়াপ থেকে এই
করন্দা অব্দি বিস্তৃত!
বিকালের
রোদ পড়ার অনেক আগেই
"একবার আসছি" বলে, সেসব সচক্ষে
দেখার লোভে বেড়িয়েই পড়লাম। রাস্তায়
কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করতেই কয়েকটি মন্দিরের
সন্ধানও পেলাম। একপা
একপা করে এগোচ্ছি, আর
ভাবছি, কি জানি পরের
মন্দিরগুলো কেমন হবে! একটা
নাহয় ভাঙাচোরা, তাবলে সবকটাই কি
তাই হবে!...... মনকে বারবার সান্ত্বনা
দিয়ে বুঝিয়েও লাভ হলো না!
এক একটি মন্দির, যেন
এক একটি ইতিহাসের খনি!
হ্যাঁ, খনি। আমাদের
বঙ্গীয় ঘরানার নিজস্ব সম্পত্তি,
ভাণ্ডারের বিবিধরতনের এক একটি দুর্মূল্য
মাণিক্য। দেবালয়ের
দেওয়ালে আঁকা, খোদাই করা
প্রতিটা চরিত্রে, প্রতিটা অলঙ্করণের খাঁজে খাঁজে যেন
মধ্যযুগীয় সাবেকীয়ানা আর স্থাপত্যশৈলীর অহমিকা
উথলে উঠছে! কিন্তু, সবই
মৃতপ্রায়! জরাগ্রস্ত! ভগ্নস্তূপ! বেশীরভাগ দেবালয়ই আজ বিগ্রহশূণ্য! দেওয়াল,
চূড়ার চুনসুরকি ফাটিয়ে বটঅশ্বত্থের পাল্লা
দেওয়া বাড়, বেড়েই চলেছে!
রত্নশৈলীর প্রতিষ্ঠানগুলি প্রায় রত্নশূণ্য! কোনোটা
সম্পূর্ণ লুপ্ত কোনোটা অর্ধলুপ্ত
আবার কোনোটা "ভাঙবো, কিন্তু মচকাবো
না!" হয়ে কোনোক্রমে এর
ঘাড়ে, ওর কাঁধে ভর
দিয়ে আধশোয়া হয়ে রয়েছে যেন!
যে কয়েকটিতে এখনও সেবাপূজো হয়
থুড়ি! বলা ভালো, মানুষের
নিয়মিত যাতায়াত আছে; সেগুলি দেখে
বোঝা গেলো, নেহাতই নিয়মরক্ষা
করে দু'টো ফুল
ছোঁড়া ছাড়া স্থানীয়দের কাছে
আর কোনো মর্যাদাই এদের
নেই! এক একটি মন্দিরে
যাচ্ছি, বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে,
ঘুরে দেখছি; বারবার মনে
হচ্ছে যেন মন্দিরগাত্রে পোড়ামাটির
চরিত্রগুলো কিছু বলতে চাইছে!
বর্তমানে তাদের কী মূল্যবোধ,
সেটা জানতে চাইছে! সুদূর
অতীতের ধূলোপড়া পরিচয়পত্রগুলো পুনরুদ্ধার করার কাতর আর্জি
জানাচ্ছে যেন! বা হয়তো,
আমাকে দেখে নিজেদের মধ্যে
ধিক্কারের হাসি হাসছে আর
টিটকারি করছে.... "ঐ দ্যাখ, আরও
এক ব্যাটা এসেছে.... আমাদের
মতো গঙ্গাযাত্রীদের ক্যামেরাবন্দি করতে, তা কর
কর! কদিন'ই বা
আর বাঁচবো, যারা গালভরা প্রতিশ্রুতি
দিয়ে কত সাধ্যসাধনা করে
কাঠখড় পুড়িয়ে আমাদের জন্ম
দিলো, যাদের হাতে আমাদের
দায়ভার দিয়ে গেলো, তারাই
সব একএক করে কেটে
পড়েছে! আমরা আজ জন্মপরিচয়
রহিত অনাথ... যাক, তবুও দেখে
শান্তি যে কয়েকজন অন্তত
দেখতে আসে আমাদের কালেভদ্রে......
ছবি নিয়ে যায়, তাই'ই সই! মরার
পরে হয়তো এই ছবিগুলো
ছাড়া আর আমাদের কোনো
অস্তিত্বই আর থাকবে না!
এখনকার লোকদেখানো ভাবভক্তির যা বহর, তাতে
দু/দশবছর পরে কারুর
মনেও থাকবে না!"
কয়েকটা
শিবমন্দিরের আবার চূড়ার অংশটা
বোঝাই দায়! এমনভাবে গাছপালা
হয়েছে, যেন গর্ভকক্ষে ধারণ
করা ধূর্জটি'র মতো তারাও
শখ করে মাথায় জটা
বেঁধেছে! আর যে সবথেকে
নির্মম, দয়ামায়ার লেশমাত্র যার কাছে নেই,
সেই মহাকালের গ্রাস যেন সবশুদ্ধ
না গিলে মন্দিরগুলোকে এদিক
থেকে একবার, ওদিক থেকে
একবার দাঁত-নখ বসিয়ে
খামচেকামড়ে আধখাওয়া মৃতদেহের মতো ভয়ঙ্কর করে
দিয়েছে! সেই ভাঙা জায়গাগুলোতে
যখন হাত দিচ্ছি, পড়ন্ত
সূর্য্যাস্তের নির্জন আলোআঁধারিতে যেন
মন্দিরগুলোই কেঁপে উঠছে! আমার
হাতের ছোঁয়াটাও যেন তাদের কাছে
বিষতুল্য! কারণ জিজ্ঞেস করায়
যেন ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো, "এইতো,
ক'দিন আগে কীসব
নাকি সড়ক যোজনার কাজ
হচ্ছিলো.. তখন ওদের লোকগুলো
আমাদের গায়ের ইঁটগুলোই শাবল
মেরে তুলেছে রে, গায়ে
কত পোড়ামাটির গয়নাগাঁটি ছিলো, সেগুলোকেও গাঁইতির
ঘা মেরে তুলে নিয়েছে...
রাস্তার খানাখন্দ ভরানোর জন্য...! বল
দেখি, ইঁটের শরীর বলে
কি আমাদের পাঁজরের হাড়
নেই? নাকি প্রতিবাদ করতে
পারিনা বলে, আমাদের প্রাণ
নেই! সেই কবে থেকে
রোদ-ঝড়-বৃষ্টি মাথায়
নিয়ে কতজনের উত্থানপতন, ভাঙাগড়ার
নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে
আছি বল দেখি! আমরাই
নাকি ইতিহাস হয়েছি আজ!
তা, এই বুঝি তোদের
ইতিহাসের প্রতি মূল্যবোধ! নাকি,
যৌবন হারিয়ে আজ অষ্টাবক্র
হয়েছি বলে আমরা কাঁধের
বোঝা হয়েছি তোদের!"
বাসায়
ফেরা শ্রান্ত পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ, মথার উপরে
কৃষ্ণপক্ষের একফালি চাঁদের আভা,
খোলামাঠের দিক থেকে আসা
খোলা বাতাসের গন্ধে যেন তিনশো
বছরের পুরোনো ইতিহাস ফুঁপিয়ে
ফুঁপিয়ে কাঁদছে! সেই কান্না বাতাসে
ভেসে সারা গ্রামকে জানান
দিচ্ছে। কিন্তু
কান পেতে শোনার মতো
কেউ নেই, এটা নিঃসন্দেহে
বলা যায়.....! থাকলে অন্তত, স্বার্থপর
মানুষের আর্থিক লালসায় মন্দির
ভেঙে ঝাঁ-চকচকে দোকানঘর
বা রাস্তা তৈরী হতোনা!
এককালের মাথা থেকে পা
অব্দি অলঙ্কার শোভিতা, অখণ্ডযৌবনা "দেবদাসী দেউল", আজ কালের সর্বগ্রাসী
ক্ষুধায় নিজের সমস্তটুকু বিসর্জ্জন
দিয়ে অশীতিপরা নগরবধূ!
ভারাক্রান্ত
মনে, বাড়ীর পথে আসছি। রাস্তাগুলো
ক্যামন যেন অচেনা মনে
হচ্ছে! নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার অবাঞ্ছিত অনুকরণে যখন গ্রাম্য জনজীবন
আস্তে আস্তে জীবনযাত্রার গতিধারা
পাল্টাচ্ছে, সেইসময়েরই এক সন্ধ্যায় অখ্যাত
এক গ্রামে কয়কেঘন্টার তফাতে
যেন গত তিনশো বছরের
ইতিহাস পরিক্রমা করে এলাম! আসার
পথে হঠাৎই, ঘন্টার আওয়াজ। লক্ষ্য
করে এগিয়ে গেলাম সেদিকে। "দালান শৈলী"-র ঠাকুরবাড়ী।
অধিষ্ঠাতাঃ শ্রী শ্রী কৃষ্ণ-বলরাম জিউ।
ঠাকুরমা'র মুখে এই
বিগ্রহ বা মন্দিরের প্রাচীনতা
সম্পর্কে যতটুকু শুনেছিলাম, তার
সঙ্গে বর্তমান মন্দিরের কোনো মিল না
পাওয়ায় খটকা লাগলো।
প্রশ্ন নিয়েই দাঁড়িয়ে আছি। বিগ্রহের
সন্ধ্যারতি হচ্ছে। দেখতে
দেখতেই ঠাকুরমা'র কথা মনে
পড়ে গেলো। এই
"কৃষ্ণ-বলরাম" জিউয়ের কারণেই করন্দা
গ্রামে কোনো দোতলা বাড়ী
নেই। এককালীন
সংস্কার, যেহেতু জমিদার মশাইয়ের
কুলদেবতা একতলা মন্দিরে আছেন,
তাই গ্রামের সবার বসতবাড়ীও একতলাই
থাকবে। আজ
যদিও সেসব বালাইয়ের কেউ
ধারও ধারেন'না।
ইতিউতি বেশ অনেকগুলিই দো'তলা বাড়ী সকালে
আসার সময়েই নজরে পড়েছে। যাইহোক,
পুরোহিত মশাইকে জিজ্ঞেস করে
জানলাম, এই মন্দিরটিও নাকি
প্রায় ধ্বংস হতে বসেছিলো। তাই
গত ১৪১৫ বঙ্গাব্দে তৎকালীন
জমিদার বংশীয় প্রতিনিধি স্বর্গীয়
শিশিরকুমার রায় মশাই শ্রী
কৃষ্ণ-বলরাম মন্দির ও
পারিবারিক দুর্গাদালানটি নতুন করে তৈরী
করিয়েছেন। জমিদারদের
বর্তমান বংশধরদের তরফে কৃষ্ণ-বলরাম
মন্দির ও দুর্গামন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ-সেবাপূজা হলেও ঐতিহাসিক শিবমন্দিরগুলি
কেন ব্রাত্য, এই প্রশ্ন করতেই
জমিদার বংশের ইতিহাস সম্পর্কে
পুরোহিত মশাইয়ের থেকে যা শুনলাম
সেটাই বলার চেষ্টা করছি,
জমিদারীর
ইতিহাস আনুমানিক আড়াইশো বছর প্রাচীন। জমিদার
বংশের দ্বিতীয় পুরুষ স্বর্গীয় ভাগবত
রায় মশাইয়ের আমলেই নাকি বাড়বাড়ন্ত
হয়। কুলদেবতা
শ্রী কৃষ্ণ-বলরাম ও
কুলদেবী শ্রী শ্রী দুর্গামাতাঠাকুরাণীর
মন্দির স্থাপন(প্রতিষ্ঠাকালঃ ১২২৪
বঙ্গাব্দ), নিত্য/বার্ষিক সেবাপূজার
সঙ্গে পূর্বোল্লিখত শিবমন্দিরগুলি জমিদারী সত্ত্বে লাভ করে সংস্করণ
ও স্থায়ী সেবাপূজার ব্যবস্থাও
জমিদার মশাইয়ের সুষ্ঠু পরিচালনায় নির্বাহিত
হতো।
তখন
থেকেই নাকি নির্দিষ্ট কয়েকজন
পুরোহিতকে শিবমন্দিরগুলির দায়িত্ব ব্রহ্মোত্তর সত্ত্বে দান করা হয়। এই
ধারা ১৩৪৯ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত
যথাযথ ভাবে প্রবাহিত হয়ে
এসেছে। কিন্তু,
ঐবছরেই(১৩৪৯ বঙ্গাব্দ, ১৯৪২
খ্রীস্টাব্দ) করন্দা এবং সংলগ্ন
চণ্ডীপুর ও খাঁড়গ্রাম অঞ্চলে
হঠাৎ করে "বেরিবেরি" রোগের প্রকোপে অসংখ্য
মানুষের অকালমৃত্যু হয়। বাকীরা,
প্রাণের দায়ে মহামারীর কবল
থেকে বাঁচার তাগিদে সময়
থাকতেই সড়ে পড়তে থাকেন। গ্রাম
প্রায় শূন্য। চাষবাসের
কোনো উপায় নেই।
নায়েব, খাজাঞ্চী, রায়তারা প্রাণের তাগিদে পরিবার সমেত
রাতারাতি সড়ে পড়েছেন।
ওদিকে সরকার বাহাদুরের খাজনা
কীভাবে মেটানো হবে, এই
চিন্তায় তৎকালীন জমিদার স্বর্গীয় শ্রীনাথ
রায় মশাইয়ের রাতের ঘুম উড়ে
গেছে! অনেক ভাবনা চিন্তা
করেও কোনো উপায় না
পেয়ে অবশেষে বড়শুল গ্রাম
নিবাসী মহাজন 'নীলমণি সেন'-এর কাছ থেকে
চড়া সুদে টাকা ধার
নিতে বাধ্য হ'ন। সরকারের
খাতে কোনোমতে খাজনা মেটালেন।
গলা অব্দি দেনার দায়ে
জর্জরিত জমিদার মশাই! অবশ্য
একটা ক্ষিণ আশাও রেখেছিলেন
মনে। এবছরে
লোকবলের অভাবে যা ক্ষয়ক্ষতি
হলো, সামনের বছর নিশ্চয়ই
তার ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব হবে। মহামারীর
প্রকোপ আস্তে আস্তে কমে
গেলে, বেশ কয়েকজন প্রজা
ফিরেও আসে। নতুন
করে আশার মুখ দেখে
জমিদার মশাই নিজের তদারকিতেই
জমিদারীর কাজ হাতে নে'ন। কিন্তু
নিয়তির অমোঘ পরিহাসে আবারও
শ্রীনাথ রায় সর্বস্বান্ত হ'ন। সেইবছরই,
গ্রামের পার্শ্ববর্তী খড়ি নদীর বন্যায়
ফলন্ত মাঠের সব ফসল
বন্যার গ্রাসে চলে যায়!
একে সুদেআসলে টাকার দেনা, তারউপরে
সরকারের খাজনা.... কীইবা করেন এবার?
আর কোনো আশার মুখ
না দেখে বাধ্য হয়েই,
নদীর বিপরীত তীরে থাকা
দেবোত্তর ও ব্রহ্মোত্তর জমিজমা
বিক্রি করে খাজনা ও
দেনা শোধ করতে বাধ্য
হ'ন।
সব শেষ...! জমিদারী সামলানো তো দূরহস্ত, নিজের
সংসার প্রতিপালনের ন্যুনতম সামর্থ্যটুকুও আর নেই জমিদারের। সত্ত্বভোগী
শিবমন্দিরের পুরোহিতরা উপার্জনের আর কোনো উপায়
না দেখে, গ্রাম ছাড়েন!
পড়ে থাকেন শুধু জমিদার
মশাই, সঙ্গে কয়েকঘর প্রজা,
শ্রীকৃষ্ণ-বলরাম, দুর্গাঠাকুরাণীর কাঠামো
আর আঠারোটি শিবমন্দির! পরিস্থিতির জটিলতা বাড়তে বাড়তে
এমন পর্যায়ে আসে যে, 'দিন
এনে দিন খাওয়া'-র
পর্যায়ে জমিদার শ্রীনাথ রায়
পতিত হ'ন।
একে বন্যাবিধ্বস্ত, তার উপরে নিত্যসেবাপূজা
রহিত শিবমন্দিরগুলি সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে
চোখের সামনে শেষ হতে
থাকে। সর্বোপরি,
যাঁদের প্রতিষ্ঠিত দেবালয়ে শিবের আরাধনা শুরু
হয় সেই বর্ধমান রাজপরিবারের
তৎকালীন শাসক মহারাজাধিরাজ উদয়চাঁদ
মোহতাব বাহাদুরের তরফ থেকেও কোনো
সাহায্য পাওয়া যায়নি!
পরবর্তীতে
বহুকষ্টে বেশ কয়েক প্রজন্ম
পরে করন্দা রায় পরিবার
অবস্থা ফিরে পায়।
নতুন করে শ্রীকৃষ্ণ-বলরাম
ও শ্রী শ্রী দুর্গা'র নতুন মন্দির
নির্মিত হয়। দুর্গামন্দিরটি
পুনঃসংস্করণ করা হয় গত
১৪১৫ বঙ্গাব্দে। তৎকালীন
প্রতিনিধি স্বর্গীয় শিশির কুমার রায়
মশাইয়ের নেতৃত্বে। এখানকার
দুর্গাদালানটি বেশ অভিনব গঠনশৈলীর। খড়ের
ছাউনি দেওয়া পাকা দেওয়ালের
মণ্ডপ যদিও সিঁড়ি ব্যতীত
মেঝের বাকী অংশটি মাটির। কড়িকাঠের
জায়গায়, সেগুনের ফ্রেম দিয়ে খাঁচার
আকৃতি খিলান করা।
খিলানের মাথায়, শঙ্খচিল, ময়ূর
ইত্যাদি খোদাই করা আছে। এরকম
দালানকে নাকি "মাঠকোঠা দালান" বলা হয়।
এককথায়, রায়বাড়ীর ঠাকুরদালানটি অনবদ্য গঠনশৈলীর দাবিদার। দুর্গোৎসব
এবং কৃষ্ণ-বলরামের সেবা
আজ অব্দি হয়ে আসছে। শারদোৎসব
ও পঞ্চম দোলের অনুষ্ঠানে
রায়পরিবারের সাথে সারা গ্রামের
জনগণও কমবেশী অংশগ্রহণ করেন। সেসব
হলেও শিবমন্দিরগুলির কোনো ব্যবস্থাই করা
যায়নি। বন্যার
জলে বেশীরভাগ শিবলিঙ্গ ভেসে চলে যায়। কয়েকটি
ঘা খেয়ে টুকরো টুকরো
হয়ে ভেঙে যায়।
তাই আজ সেই সব
ভাঙা বিগ্রহের অংশগুলি পূর্বোক্ত বারোয়ারী তলা'র শিবমন্দিরেই
রাখা আছে। আগেই
বলেছি যে, কয়েকটিতে পূজো
হয়, তা নিয়মরক্ষা বৈ
কিছু না! মন্দিরের অবস্থা
যারপরনাই জরাগ্রস্ত! নিজেদের দৈন্যদশা যেন চোখে আঙুল
দিয়ে দেখাচ্ছে! আর সঙ্গে নিজেদের
পরিচিতির প্রমাণপত্র জাহিরের আবেদন জানাচ্ছে! আজও
হয়তো নিস্তব্ধ রাত্রে পরিত্যক্ত মন্দিরের
ক্ষয়ে আসা পঙ্খ, টেরাকোটার
অলঙ্করণগুলো যেন একটা প্রদীপের
আশায় বসে থাকে।
শূণ্যদেউল, সেবায়েতশূণ্য দরজাহীন মন্দিরগুলোকে দেখলে মনে হয়,
যেন ফোকলা দাঁত বের
করে সেগুলো বোবাকান্না কাঁদছে...!
অথবা, বিধাতার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, মনুষ্যকুলের দিকে তাকিয়ে ধিক্কারের
হাসি হাসছে!
ইতিহাসবিমুখ
জাতি কি কোনোদিনই এদের
দিকে দেখবে না! আজ
এদের সংখ্যা কমতে কমতে
আঠারো থেকে পাঁচটি তে
এসে ঠেকেছে...! সম্প্রতি বছরখানেক আগে নাকি কোনো
এক সম্পন্ন গ্রামবাসী নিজের ধানের গোডাউন
তৈরী করানোর জন্য দু'টি মন্দির সম্পূর্ণ
ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন.....! চোখের
সামনে দেখে এলাম, টোটো
স্ট্যাণ্ডের টোটোওয়ালা'রা মন্দিরের পঙ্খ
অলঙ্কৃত ইঁট দিয়ে টোটোর
চাকায় ঠেকা দিচ্ছেন..!!!!!!! রাস্তার
ছোটোবড় খানাখন্দগুলো একটু ভালো করে
নিরীক্ষণ করলেই বোঝা যায়
যে, সেগুলো ঐ মন্দিরগুলোরই
ইঁট ভেঙে ভরাট করা
হয়েছে..!!!!!
এই কারণেই কি কবিগুরু
শতবছর আগেই লিখে গেছিলেন,
"সাতকোটি
সন্তানে হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছো
বাঙালী করে, মানুষ তো
করোনি!"
চিত্র
ও তথ্যসূত্রঃ শ্রীমান শঙ্খ


































No comments:
Post a Comment