Thursday, April 25, 2019

এশিয়ার সর্বোচ্চ অষ্টধাতুর দুর্গামূর্তি


ঐতিহ্যের ইতিহাসপর্বঃ 
 আজ বনেদীয়ানা'য় প্রকাশিত হল এশিয়ার সর্বোচ্চ অষ্টধাতুর দুর্গাপ্রতিমা। আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ সদস্যা শ্রীমতী দেবযানী বসু মহাশয়া।

 এশিয়ার সর্বোচ্চ অষ্টধাতুর দুর্গামূর্তি।
পরমা প্রকৃতি মহাশক্তি দেবীদুর্গা বৎসরান্তে একবার আসেন মর্ত্যে। এই মহাশক্তিকে বরণ করার উৎসবে মেতে ওঠেন বাঙালিরা। দুর্গাপুজো বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব হলেও বাংলাদেশে দুর্গাপুজোর ইতিহাস বেশ প্রাচীন। কলকাতায় বহু প্রাচীন কাল থেকেই এই অঞ্চলে কয়েকটি পারিবারিক দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হত। ক্রমে পারিবারিক গণ্ডী ছাড়িয়ে মা দুর্গা ছড়িয়ে পরলেন সর্বজনের মধ্যে। আজ সার্বজনীন পুজোর রমরমাই বেশী। কিন্তু চারদিনের সার্বজনীন পুজোয় দেবীর অপার মহিমা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। আদ্যাশক্তিকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে হলে চাই নিত্য আরাধনা। নিত্যপূজার এই ধারনাই সার্থক রূপ পেয়েছে দক্ষিণ কলকাতার ২৩পল্লী মন্দিরে।
 মা দুর্গা এখানে নয়নাভিরাম অষ্টধাতুর মূর্তিতে সারাবছর পূজিতা। এই অষ্টধাতুর স্থায়ী মন্দিরের মাতৃমূর্তি তৈরির পেছনে রয়েছে কয়েকটি ঘটনার সমাবেশ। ১৯৩৯ সালে সার্বজনীন পূজা হিসাবে শুরু হলেও ১৯৭১ সাল থেকে চাঁদা তুলে পূজা বন্ধ করে দেন পূজার উদ্যোক্তারা এবং নিজেরাই বহন করতে থাকেন পূজার ব্যয়ভার। কিন্তু শারদীয়া পূজার কদিনে নয়, সমাজের প্রতিটি মানুষকে প্রতিদিন শক্তির উপাসনায় উৎসাহিত করার চেতনা থেকেই ২৩পল্লীর পূজা কমিটির উদ্যোক্তারা এই সিদ্ধান্ত নেন। তারা সিদ্ধান্ত নেন মৃন্ময়ী কাত্যায়নীকে ধরাধামে ধরে রাখার, এবং তার জন্যই মাতৃমন্দির প্রতিষ্ঠা।

 এরই ফলস্বরূপ ধর্মপ্রাণ পল্লীবাসীর অকুণ্ঠ সহযোগিতায় ১৯৮৫ সালে সম্পূর্ণ হয় মন্দির নির্মাণের কাজ। এরপর ১৯৮৬ সালে ১৪ফুট উচ্চতার অষ্টধাতুর দুর্গামূর্তি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মন্দির হয়ে ওঠে প্রকৃত দেবালয়। পূজার ঠিক আগে জগৎগুরু শঙ্করাচার্য মূর্তির আবরণ উন্মোচন করেন। বেনারসের ধাতুশিল্পী শিউনাথ বিশ্বকর্মা এই মূর্তির সার্থক রূপকার। এই মূর্তির পরিকল্পনা করেছিলেন শ্রী প্রবোধরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় এবং কুমোরটুলির প্রখ্যাত প্রতিমাশিল্পী শ্রী জিতেন পাল মহাশয়। মূর্তির নির্মাণশৈলীতে প্রাচ্য শিল্পরীতিই স্পষ্ট।
 মায়ের রঙ এখানে স্বর্ণবর্ণা, মাথায় চন্দ্রকলাশোভিত জটা, বাঘছাল পরিহিতা মা এখানে হিমালয় কন্যা রূপেই অবস্থিতা। পরমবৈষ্ণবীরূপেই আরাধনা হয় মায়ের। বৃহৎনান্দিকেশ্বর পুরাণ মতে পূজা হলেও চক্ষুদান, প্রাণপ্রতিষ্ঠা ইত্যাদি হয় না। পঞ্চমীতে বোধন,  চণ্ডীপাঠ, সপ্তমীতে মহাস্নান, অষ্টমীতে নবঘট স্থাপন, চৌষট্টি যোগিনীর পূজা ইত্যাদি এখানকার বৈশিষ্ট্য।

 বৈষ্ণব মতে দেবীপূজা হওয়ায় পূজার নৈবেদ্য ও ভোগে কোনও আমিষ ভোগ দেওয়া হয় না। দশমীতে দেওয়া হয় টকদই, খই, চিড়ে ইত্যাদি। নবঘট ও নবপত্রিকা বিসর্জন দিয়ে সমাপ্ত হয় শারদীয়া দুর্গাপুজো। সনাতন ভারতের ধর্ম, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার এক মূর্ত প্রতীক এই দুর্গাপুজো। কিন্তু আজকের সার্বজনীন পুজোয় সেই ধর্মাভাব, নেই একতা। তারই প্রতিফলন আজকের সমাজে। সমাজের এই ভাঙনকে রুখতে মাতৃপূজাই হতে পারে একমাত্র পথ, ২৩পল্লীর মন্দিরে দুর্গার এই চিরস্থায়ী অনন্যমূর্তি তারই পথিকৃৎ।
তথ্যসূত্রঃ শ্রীমতী দেবযানী বসু(সাংবাদিক)


No comments:

Post a Comment